শ্রীবিষ্ণুপুরাণ দ্বিতীয় অধ্যায় সম্পূর্ণরূপে বঙ্গানুবাদ

শ্রীবিষ্ণুপুরাণ বঙ্গানুবাদ | প্রথম অধ্যায় সম্পূর্ণ পাঠ - Hindu Kaal Chakra

শ্রীবিষ্ণুপুরাণ

দ্বিতীয় অধ্যায়

চবিবশ তত্ত্ব বর্ণনা প্রসঙ্গে জগতের উৎপত্তি-ক্রমের বর্ণনা ও শ্রীবিষ্ণুর মহিমা

good of Narayan Image
👁️ 1,024
❤️ 248


শ্রীপরাশর বললেন -- যিনি ব্রহ্মা, বিষ্ণু ও শংকররূপে জগতের উৎপত্তি, স্থিতি ও সংহারের কারণ, এবং নিজ ভক্তদের সংসারসমুদ্র থেকে উদ্ধার করেন, সেই বিকাররহিত, শুদ্ধ, অবিনাশী, পরমাত্মা, সর্বদা একরস (সম), সর্ববিজয়ী, ভগবান বাসুদেব বিষ্ণুকে নমস্কার। ১-২ যিনি এক হয়েও নানারূপসম্পন্ন, স্থুল-সূক্ষ্ণময়, অব্যক্ত (কারণ) এবং ব্যক্ত (কার্য) রূপ এবং (তাঁর অনন্য ভক্তদের) মুক্তির কারণ, (সেই শ্রীবিষ্ণু ভগবানকে নমস্কার)। ৩। যে বিশ্বরূপ প্রভু বিশ্বের উৎপত্তি, স্থিতি এবং সংহারের মূল কারণ, সেই পরমাত্মা শ্রীবিষ্ণু ভগবানকে নমস্কার।। ৪। যিনি বিশ্বের অধিষ্ঠান, অতি সূক্ষ্ণ থেকেও সূক্ষ্ণ, সর্ব প্রাণীতে স্থিত পুরুষোত্তম এবং অবিনাশী, যিনি পরমার্থত (বাস্তবে) অতি নির্মল জ্ঞান স্বরূপ, কিন্তু অজ্ঞতাবশত নানা পদার্থরূপে প্রতীত হন, এবং যিনি (কালস্বরূপে) জগতের উৎপত্তি ও স্থিতিতে সমর্থ এবং তার সংহারকারী, সেই জগদীশ্বর, অজ, অক্ষয় এবং অব্যক্ত ভগবান শ্রীবিষ্ণুকে প্রণাম করে তোমাকে সেই সমস্ত প্রসঙ্গ ক্রমশ শোনাচ্ছি, যা দক্ষ ইত্যাদি মুনিশ্রেষ্ঠদের জিজ্ঞাসায় পিতামহ ব্রহ্মা তাঁদের বলেছিলেন। ৫-৮।।

দক্ষ ইত্যাদি মুনিগণ নর্মদার তীরে সেই প্রসঙ্গ রাজা পুরুকৃৎসকে শুনিয়েছিলেন এবং পুরুকৃৎস সারস্বতকে এবং সারস্বত আমাকে বলেছেন। ৯। 'যাঁ পরের (প্রকৃতির) থেকেও পর, পরমশ্রেষ্ঠ, অন্তরাত্মায় অবস্থিত পরমাত্মা, রূপ, বর্ণ, নাম এবং বিশেষণাদি রহিত; যাঁতে জন্ম, বৃদ্ধি, পরিণাম, ক্ষয় এবং বিনাশ এই ছয় বিকারের সর্বতোভাবে অভাব, যাঁকে শুধুমাত্র সর্বদা 'আছে' -- এইটুকুই বলা যায় এবং যাঁর জন্য এটি প্রসিদ্ধ যে 'তিনি সর্বত্র অবস্থিত এবং তাঁতেই সমগ্র বিশ্ব অধিষ্ঠিত-তাই বিদ্বানরা যাঁকে বাসুদেব বলেন' তিনিই হলেন নিত্য, অজ, অক্ষয়, অব্যয়, একরস এবং সর্বথা দুর্গুনশূণ্য নির্মল পরব্রহ্ম। ১০-১৩। তিনিই এই সব ব্যক্ত (কার্য) এবং অবাক্ত (কারণ) জগতের রূপে এবং তার সাক্ষীপুরুষ

এবং মহাকারণ কালের রূপে স্থিত। ১৪। হে দ্বিজ! পরব্রহ্মের প্রথম রূপ হলো পুরুষ; অব্যক্ত (প্রকৃতি) ও ব্যক্ত (মহদাদি) তার অন্য রূপ এবং (সকলের ক্ষোভিতকারী হওয়ায়) কাল হলো তার পরমরূপ। ১৫৷৷

এইভাবে যিনি প্রধান, পুরুষ, বাক্ত এবং কাল-এই চারের অতীত এবং যাকে পণ্ডিতগণই দেখতে পান সেটিই হলো ভগবান বিষ্ণুর পরমপদ। ১৬। প্রধান, পুরুষ, ব্যক্ত এবং কাল- (ভগবান বিষ্ণুর) এসকল রূপ বিভিন্ন জগতের উৎপত্তি, পালন ও সংহারের প্রকাশ এবং উৎপাদনের কারণ। ১৭। ভগবান শ্রীবিষ্ণু যে ব্যক্ত, অবাক্ত, পুরুষ ও কালরূপে স্থিত হন, এ সবই তাঁর বালকোচিত ক্রীড়া বলে মনে করবে।। ১৮।

তারমধ্যে অব্যক্ত কারণকে, যা সৎ-অসৎরূপ (কারণ-শক্তিবিশিষ্ট) এবং নিত্য (সর্বদা একরস), শ্রেষ্ঠ মুনিগণ তাকে প্রধান তথা সূক্ষ্ম প্রকৃতি বলেন। ১৯।। সেটি ক্ষয়রহিত, তার অন্য কোনো আধারও নেই এবং তা অপ্রমেয়, অজর, নিশ্চল শব্দ-স্পর্শ-শূন্য এবং রূপাদিরহিত। ২০। তা ত্রিগুণময় এবং জগতের কারণ তথা স্বয়ং অনাদি এবং উৎপত্তি ও লয়রহিত। এই সম্পূর্ণ প্রপঞ্চ প্রলয়কাল থেকে সৃষ্টির আদি পর্যন্ত তাতেই ব্যাপ্ত ছিল। ২১। হে বিদ্বান্! শ্রুতির মর্মজ্ঞ ব্যক্তিগন, শ্রুতিপরায়ণ ব্রহ্মবেত্তা মহাত্মাগণ এই অর্থ লক্ষ্য করে প্রধানের প্রতিপাদকগণ এই নিম্নলিখিত শ্লোকটি বলে থাকেন-। ২২। 'সেই সময় (প্রলয়কালে) না দিন ছিল, না রাত্রি, না আকাশ ছিল, না পৃথিবী, না অন্ধকার ছিল, না

আলোর প্রকাশ এবং অতিরিক্তও কিছু ছিল না। শুধুমাত্র শ্রোত্রাদি ইন্দ্রিয় এবং বুদ্ধি ইত্যাদির অবিষয় এক প্রধান ব্রহ্ম এবং পুরুষই ছিল'। ২৩।

হে বিপ্ল! বিষ্ণুর পরম (উপাধিরহিত) স্বরূপ থেকে প্রধান ও পুরুষ- এই দুই রূপ হয়েছে; সেই বিষ্ণুরই অপর যে রূপ দ্বারা এই দুটি (সৃষ্টি ও প্রলয়কালে) সংযুক্ত ও বিযুক্ত হতে থাকে, সেই রূপান্তরেরই নাম হলো 'কাল'। ২৪। বিগত প্রলয়কালে এই বাক্ত প্রপঞ্চ প্রকৃতিতে লীন ছিল, তাই প্রপঞ্চের এই প্রলয়কে প্রাকৃত প্রলয় বলা হয়। ২৫। হে দ্বিজ! কালরূপ ভগবান অনাদি, তাঁর কোনো অন্ত নেই, তাই জগতের উৎপত্তি, স্থিতি ও

প্রলয়ও কখনও বাধাপ্রাপ্ত হয় না। (তা প্রবাহরূপে নিরন্তর হতে থাকে)। ২৬।

হে মৈত্রেয়! প্রলয়কালে প্রধান (প্রকৃতি) সাম্যাবস্থাতে স্থিত হলে এবং প্রকৃতি পুরুষের থেকে পৃথক স্থিত হয়ে গেলে শ্রীবিষ্ণু ভগবানের কালরূপ (এই দুটি ধারণ করার জন্য) প্রবৃত্ত হয়।। ২৭।। তারপর (সর্গকাল উপস্থিত হলে) সেই পরব্রহ্ম পরমাত্মা বিশ্বরূপ সর্বব্যাপী সর্বভূতেশ্বর সর্বাত্মা পরমেশ্বর নিজ ইচ্ছা দ্বারা বিকারী প্রধান এবং অবিকারী পুরুষে প্রবিষ্ট হয়ে তাঁকে ক্ষোভিত করেন। ২৮-২৯। যেমন ক্রিয়াশীল না হলেও গন্ধ নিজ সন্নিধিমাত্রেই মনকে উৎফুল্ল করে, তেমনই পরমেশ্বর তাঁর সন্নিধিমাত্রেই প্রধান ও পুরুষকে প্রেরণ-দান করেন। ৩০। হেব্রহ্মন। সেই পুরুষোত্তমই এঁকে ক্ষোভিত করেন এবং তিনিই ক্ষুব্ধ হন আর সঙ্কোচ (সাম্য) ও বিকাশ (ক্ষোভ) যুক্ত প্রধানরূপে তিনিই স্থিত। ৩১। ব্রহ্মা ইত্যাদি সমস্ত ঈশ্বরেরও ঈশ্বর এই বিষ্ণুই সমষ্টি-ব্যাষ্টি-রূপ, ব্রহ্মাদি জীবরূপ এবং মহত্তত্ত্বরূপে স্থিত হন।। ৩২।

হে দ্বিজশ্রেষ্ঠ। সর্গকাল উপস্থিত হলে গুণাদির সাম্যাবস্থারূপ প্রধান যখন ক্ষেত্রজ্ঞরূপে (বিষ্ণু) অধিষ্ঠিত হন তখন তার থেকে মহত্তত্ত্বের উৎপত্তি হয়।। ৩৩। উৎপন্ন হওয়া মহানকে প্রধানতত্ত্ব আবৃত করেছে। মহত্তত্ব সাত্ত্বিক, রাজসিক ও তামসিক ভেদে তিন প্রকারের হয়ে থাকে। কিন্তু বীজ যেমন খোসাদ্বারা সমভাবে আবৃত থাকে, তেমনই এই ত্রিবিধ মহত্তত্ত্ব প্রধানতত্ত্ব দ্বারা সব দিক থেকে ব্যাপ্ত থাকে। অতঃপর ত্রিবিধ মহত্তত্ত্বদ্বারাই বৈকারিক (সাত্ত্বিক), তৈজস (রাজসিক) এবং তামসিক ভূতের তিন প্রকারের অহংকার উৎপন্ন হয়। হে মহামুনে! সেটি ত্রিগুণাত্মক হওয়ায় ভূত ও ইন্দ্রিয় ইত্যাদির কারণ হয় এবং যেমন প্রধানের দ্বারা মহত্তত্ত্ব ব্যাপ্ত আছে, তেমনই মহত্তত্ত্ব

দ্বারা সেই (অহংকার) ব্যাপ্ত থাকে।। ৩৪-৩৬।। ভূতাদি নামের তামস অহংকার বিকৃত হয়ে শব্দ-তন্মাত্রা এবং তার থেকে শব্দ-গুণসম্পন্ন আকাশ রচনা করেছে। ৩৭। সেই ভূতাদি তামস অহংকার শব্দ-তন্মাত্রারূপ আকাশকে ব্যাপ্ত করে। পরে (শব্দ-তন্মাত্রারূপ) আকাশ বিকৃত হয়ে স্পর্শ-তন্মাত্রারূপকে রচনা করে।। ৩৮।। তার (স্পর্শ-তন্মাত্রা)
থেকে শক্তিশালী বায়ু উৎপন্ন হয়, তার গুণকে স্পর্শ বলা

হয়, শব্দ-তন্মাত্রারূপ আকাশ স্পর্শ তন্মাত্রাসম্পন্ন বায়ুকে আবৃত করেছে। ৩৯। অতঃপর (স্পর্শ-তন্মাত্রারূপ) বায়ু বিকৃত হয়ে রূপ-তন্মাত্রা সৃষ্টি করেছে। (রূপতমাত্রাযুক্ত) বায়ুর থেকে তেজ উৎপন্ন হয়েছে, তার গুণ হল রূপ।। ৪০। শস্পর্শ-তস্মাত্রারূপ বায়ু রূপ-তমাত্রাসম্পন্ন তেজকে আবৃত করে। আবার (রূপ-তন্মাত্রাময়) তেজও বিকৃত হয়ে রস-তন্মাত্রার রচনা করে। ৪১। সেই (বস-তম্মাত্রারাপ) থেকে রস গুণসম্পন্ন জল উৎপন্ন হয়েছে। বস-তন্মাত্রাসম্পন্ন জলকে রূপ-তন্মাত্রানয় তেজ আবৃত করে।। ৪২। (রস-তন্মাত্রারূপ) জল বিকার প্রাপ্ত হয়ে গন্ধ- তন্মাত্রার সৃষ্টি করেছে, তার থেকে পৃথিবী উৎপন্ন হয়েছে যার গুণ হল গন্ধ। ৪৩। সেইসব আকাশ ইত্যাদি ভূতে তন্মাত্রা আছে (অর্থাৎ তার কেবল গুণ ও শব্দ ইত্যাদিই থাকে) তাই তন্মাত্রা (গুণরূপ) ই বলা হয়।। ৪৪ তন্মাত্রাগুলিতে বিশেষ ভাব নেই, তাই তার অবিশেষ সংজ্ঞা থাকে। ৪৫। এই অবিশেষ তন্মাত্রাগুলি শান্ত, ঘোর বা মূঢ় নয়। (অর্থাৎ তার সুখ-দুঃখ বা মোহরূপে অনুতব হতে পারে না)। এই ভাবে তামস অহংকার থেকে এই ভূত- তন্মাত্রারূপ সর্গ সৃষ্টি হয়েছে ৪৬।।

দশ ইন্দ্রিয়াদি তৈজস অর্থাৎ রাজসিক অহংকার থেকে এবং তার অধিষ্ঠাতা দেবতা বৈকারিক অর্থ্যাৎ সাত্ত্বিক অহংকার থেকে উৎপন্ন হয়েছে বলে জানানো হয়েছে। এইরূপ ইন্দ্রিয়াদির অধিষ্ঠাতা দশ দেবতা এবং একাদশতম মন হলো বৈকারিক (সাত্ত্বিক)। ৪৭ হে দ্বিজ! চক্ষু, নাসিকা, জিহ্বা, ত্বক্, এবং শ্রোত্র-এই পাঁচটি হলো বুদ্ধির সাহায্যে শব্দাদি বিষয় গ্রহণকারী পাঁচটি জ্ঞানেন্দ্রিয়। ৪৮। হে মৈত্রেয়! পায়ু (গুহ্য), উপস্থ (লিঙ্গ), হস্ত, পদ এবং বাক্-এই পাঁচটি হলো কর্মেন্দ্রিয়। এদের কাজ হলো (মল-মূত্র) ত্যাগ, শিল্প, গতি ও বচন।। ৪৯। আকাশ, বায়ু, তেজ, জল, পৃথিবী-এই পঞ্চভূত ক্রমশ শব্দ-স্পর্শাদি পাঁচ গুণের দ্বারা যুক্ত থাকে।। ৫০। এই পঞ্চভূত শান্ত, ঘোর এবং মূঢ় (অর্থাৎ সুখ, দুঃখ, মোহযুক্ত), সুতরাং একে 'বিশেষ' বলা হয় ৫১

(১)পরস্পর একত্রিত হলে সকল ভূতই (পঞ্চ মহাভূত) শান্ত, ঘোর ও মূঢ় বলে প্রতীত হয়, পৃথকভাবে পৃথিবী ও জল শান্ত, তেজ ও বায়ু ঘোর এবং আকাশ হলো মৃঢ়।


এই ভূতাদির মধ্যে পৃথক-পৃথকভাবে নানাশক্তি থাকে। সুতরাং এগুলি পরস্পর পূর্ণভাবে একত্র না হয়ে জগৎ সৃষ্টি করতে পারে না। ৫২। তাই এক-অন্যের আশ্রয়ে থাকা এবং একই সংঘাতের উৎপত্তির লক্ষ্যসম্পন্ন মহত্তত্ত্ব থেকে বিশেষ পর্যন্ত প্রকৃতির এই সমস্ত বিকার পুরুষে অধিষ্ঠিত হওয়ার জন্য পরস্পর একত্রিত হয়ে সর্বদা একভাবে প্রধান-তত্ত্বের অনুগ্রহে অণ্ডের উৎপত্তি করে। ৫৩-৫৪। হে মহাবুদ্ধে! জল-বুদ্বুদের ন্যায় ক্রমশ ভূতাদির দ্বারা বৃদ্ধিপ্রাপ্ত এই গোলাকার এবং জলের ওপর অবস্থিত মহান অণ্ড ব্রহ্ম (হিরণ্যগর্ভ) রূপ বিষ্ণুর অত্যন্ত উত্তম প্রাকৃত আধার হয়েছে।। ৫৫। তাতে এই অব্যক্ত স্বরূপ জগৎপতি শ্রীবিষ্ণু ব্যক্ত হিরণ্যগর্ভরূপে স্বয়ং বিরাজিত হয়েছেন। ৫৬। সেই মহাত্মা হিরণ্যগর্ভের সুমেরু হলো উল্ব (গর্ভ আবৃতকারী ঝিল্লী), অন্য পর্বত, জরায়ু (গর্ভাশয়) ও সমুদ্র গর্ভাশয়ের স্থিত রস ॥ ৫৭।। হে বিপ্র! সেই অগু থেকেই পর্বত ও দ্বীপ-সমেত সমুদ্র, গ্রহসহ সমস্ত জগৎ ও দেবতা, অসুর, মনুষ্য ইত্যাদি নানা প্রাণী প্রকটিত হয়।। ৫৮।। এই অণ্ড ক্রমান্বয়ে দশগুণ অধিক জল, অগ্নি, বায়ু, আকাশ এবং ভূতাদি অর্থাৎ তামসিক অহংকারে আবৃত এবং ভূতাদি মহত্তত্ত্ব দ্বারা পরিবেষ্টিত থাকে।। ৫১।। আর এই সবের সঙ্গে এই মহত্তত্ব ও অব্যক্ত প্রধান দ্বারা আবৃত। এইভাবে নারকেলের শাঁসটি যেমন বাইরের বিভিন্ন খোসার দ্বারা আবৃত থাকে, এই অণ্ডও সেইভাবে সাত প্রাকৃত আবরণ দ্বারা আবৃত থাকে।। ৬০।।

তাতে অবস্থিত হয়ে স্বয়ং বিশ্বেশ্বর বিষ্ণু ব্রহ্মা হয়ে রজোগুণের আশ্রয় গ্রহণ করে এই জগৎ-সংসার রচনায় প্রবৃত্ত হয়েছেন। ৬১। রচনা হয়ে যাওয়ার পরে সত্ত্বগুণ-বিশিষ্ট অতুল পরাক্রমী ভগবান বিষ্ণু কল্পান্ত পর্যন্ত যুগে যুগে তার পালন করে থাকেন।। ৬২। হে মৈত্রেয়! তারপর কল্পের অন্ত হলে এই জনার্দন বিষ্ণুই অতি ভীষণ রুদ্ররূপ ধারণ করে সমস্ত ভূতকে ভক্ষণ করে থাকেন।। ৬৩।। এইভাবে সর্বভূতাদিকে ভক্ষণ করে জগৎ-সংসার জলপ্লাবিত করে এই পরমেশ্বর শেষ শয্যায় শয়ন করেন। ৬৪॥


শর্যাগ্রেহণ শেষ হলে পুনরায় ব্রহ্মারূপ ধারণ করে আবার জগৎ সৃষ্টি করেন। ৬২। সেই একই অগবান জনার্দন জগতের সৃষ্টি, স্থিতি ও সংহারের জন্য ব্রহ্মা, বিষ্ণু ও শিব এই তিন সংজ্ঞা ধারণ করেন। ৬৬ এই প্রভু বিষ্ণু স্রষ্টা (ব্রহ্মা) হয়ে নিজেই সৃষ্টি করেন, পালক বিষ্ণু হয়ে পালারূপ নিজেরই পালন করেন এবং শেষকালে নিজেই সংহারক (শিব) তথা নিয়েই উপসংহৃত (লীন) হন। ৬৭ পৃথিবী, তেজ, জল, বায়ু ও আকাশ এবং সমস্ত ইন্দ্রিয়াদি ও অন্তঃকরণ ইত্যাদি যত জগৎ সবই পুরুষরূপ, কেননা সেই অব্যয় বিষ্ণুই বিশ্বরূপ ও সর্বভূতের অন্তরাত্মা, তাই ব্রহ্মাদি প্রাণীতে স্থিত সর্গাদিও তাঁরই উপকারক। (অর্থাৎ যেমন ঋত্বিজ দ্বারা করা যঞ্জ যজমানের উপকার করে, তেমনই পরমাত্মা রচিত সমস্ত প্রাণীদ্বারা হওয়া সৃষ্টি ও তাঁরই উপকারক হয়ে থাকে)। ৬৮-৬৯ সেই সর্বস্বরূপ, শ্রেষ্ঠ, বরদায়ক এবং বরেণ্য (প্রার্থনার যোগ্য) অবাবান শ্রীবিষ্ণুই ব্রহ্মা ইত্যাদি অবস্থা দ্বারা রচনাকারী, তিনিই রচিত হন, তিনিই পালন করেন, তিনিই পালিত হন এবং তিনিই সংহার করেন (এবং স্বয়ংই স্ংহৃত হন) ।।৭০।।

হতি শ্রীবিষ্ণুপুরাণে প্রথমেংহশে দ্বিতীয়োহধ্যায়ঃ।।২।।

শ্রীবিষ্ণুপুরাণের প্রথম অংশের দ্বিতীয় অধ্যায় সমাপ্ত।।২।।

এই বঙ্গানুবাদ ও ধর্মীয় তথ্যাদি সংগৃহীত হয়েছে পবিত্র গ্রন্থ “শ্রীবিষ্ণুপুরাণ” থেকে।

উৎস: Gita Press, Gorakhpur
[SINCE 1923]

প্রশ্নোত্তর (FAQ)

দ্বিতীয় অধ্যায়ে পরাশর মুনি জগতের উৎপত্তি-ক্রম, প্রধান, পুরুষ, ব্যক্ত ও কাল রূপে শ্রীবিষ্ণুর প্রকাশ এবং তাঁর মহিমা সম্পর্কে আলোচনা করেছেন।

'প্রধান' হলো অব্যক্ত কারণ, যা সৎ-অসৎরূপ এবং নিত্য, ক্ষয়রহিত, অপ্রমেয়, ত্রিগুণময় ও জগতের মূল কারণ।

'পুরুষ' ও 'কাল' শ্রীবিষ্ণুর রূপ হিসেবে বিবেচিত, যেখানে 'পুরুষ' সৃষ্টির সত্তা এবং 'কাল' সৃষ্টির সময়চক্রের প্রতীক।

পরাশর মুনি এই জ্ঞান সারস্বত মুনি থেকে প্রাপ্ত হন, যিনি পুরুকৃৎস রাজাকে এবং তিনি দক্ষ মুনিদের মাধ্যমে প্রাপ্ত হন।

এই বঙ্গানুবাদটি hindukaalchakra.blogspot.com ওয়েবসাইটে প্রকাশিত হয়েছে।

Post a Comment

Post a Comment (0)

Previous Post Next Post

এই ব্লগ শুধুমাত্র তথ্য ও শিক্ষামূলক উদ্দেশ্যে তৈরি। এখানে দেওয়া তথ্যের জন্য ব্লগ মালিক দায়ী নয় যদি তা ভুল প্রমাণিত হয়। আপনি নিজ দায়িত্বে তথ্য ব্যবহার করবেন।
This blog is for informational purposes only. We are not responsible for any loss or damage resulting from the use of information on this site.Cookie Policy Read